
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার এক তরুণ ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। পরিবারের ভাগ্য বদলানোর সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত থেমে গেছে লিবিয়ায়। দালালচক্রের প্রতারণা, জিম্মি করে নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগের মধ্যেই প্রাণ হারিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী ইকবাল মাদবর। তাঁর মৃত্যুর খবরে পরিবার ও পুরো এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
গত বুধবার (৫ আগস্ট) গভীর রাতে শিবচর উপজেলার দক্ষিণ বহেরাতলা ইউনিয়নের সরকারেরচর গ্রামের নিজ বাড়িতে ইকবালের মৃত্যুর খবর পৌঁছায়। নিহত ইকবাল মাদবর ওই গ্রামের মোতালেব মাদবরের ছেলে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কয়েক মাস আগে শিবচর উপজেলার বাঁশকান্দি ইউনিয়নের ছলেনামা গ্রামের কয়েকজন দালালের মাধ্যমে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন ইকবাল। পরিবারের দাবি, প্রথমে ২০ থেকে ২২ লাখ টাকার বিনিময়ে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে নিরাপদে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাঁকে একটি সশস্ত্র চক্রের হাতে জিম্মি করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, জিম্মি অবস্থায় ইকবালকে মুক্ত করা এবং ইতালিতে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে কয়েক দফায় অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয়। প্রথমে তাঁকে ছাড়িয়ে আনার জন্য কয়েক লাখ টাকা নেওয়া হয়। পরে আবার ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে আরও টাকা দাবি করা হয়। নিরুপায় হয়ে পরিবার ধাপে ধাপে প্রায় ১৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে। কিন্তু এরপরও তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়নি।
স্বজনদের আরও অভিযোগ, টাকা আদায়ের জন্য ইকবালের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের সেই নির্যাতনের দৃশ্য দেখিয়ে আরও ২২ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। দীর্ঘদিনের নির্যাতনে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে ৫ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর খবর দেশে পৌঁছায়।
ইকবালের মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সরকারেরচর গ্রামে শোকের মাতম শুরু হয়। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। পরিবারের সদস্যরা বলেন, পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির আশায় বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইকবাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবিত ফিরে আসা হয়নি তাঁর।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, “অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি, পরিবার ও দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বদা সচেষ্ট। নিরাপদ, বৈধ ও মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পাশাপাশি জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
এদিকে, ইকবালের পরিবার ও এলাকাবাসী এ ঘটনায় জড়িত দালালচক্রের সদস্যদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত, দ্রুত গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে ভবিষ্যতে আর কোনো তরুণ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে এমন মর্মান্তিক পরিণতির শিকার হবে না।
মাসুম হাওলাদার,মাদারীপুর প্রতিনিধি : 













