
মাটির টানে প্রবাস জীবনের ইতি টেনে দেশে ফিরেছিলেন যুবক রাসেল হোসেন (রাসেল মিয়া)। উদ্দেশ্য ছিল নিজের জমিতেই স্বাবলম্বী হওয়া। সেই স্বপ্ন থেকেই কৃষিতে মনোনিবেশ করে আজ তিনি এক অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছেন। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার দত্তপাড়া ইউনিয়নে চায়না কমলা ও মিশ্র ফল চাষ করে এলাকায় রীতিমতো সাড়া ফেলে দিয়েছেন এই প্রবাস ফেরত উদ্যোক্তা। তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ও সাফল্য এখন পুরো শিবচরজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রাসেল মিয়ার প্রায় ৮ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে বিশালাকার এক মিশ্র ফলের বাগান। এর মধ্যে প্রায় দেড় বিঘা জায়গা জুড়ে রয়েছে তার বিশেষ চায়না কমলার বাগান।
আজ থেকে প্রায় ৬ বছর আগে রাসেলের বাবা শওকত হোসেন প্রথম এই জমিতে ৬০টি ছোট জাতের কমলার চারা রোপণ করেছিলেন। শুরুতে গাছে কাঙ্ক্ষিত ফলন না আসায় বাগানটি একপ্রকার অবহেলিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। তবে ২০২১ সালের শেষ দিকে রাসেল প্রবাস থেকে দেশে ফিরে এই অবহেলিত বাগানের হাল ধরেন। হার না মেনে তিনি ইন্টারনেট ও ইউটিউব দেখে কমলা চাষের ওপর পড়াশোনা শুরু করেন এবং পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ গ্রহণ করেন।
নিবিড় পরিচর্যা আর আধুনিক কৃষি পদ্ধতি অনুসরণের পর থেকেই আসতে শুরু করে কাঙ্ক্ষিত ফল। গত দুই মৌসুম ধরে বাগানটিতে চায়না কমলার বাম্পার ফলন হচ্ছে।
চলতি মৌসুমেও কমলার অভাবনীয় ফলন হওয়ায় বাগান মালিক রাসেল মিয়া দারুণ খুশি। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের প্রতিটি গাছের ডালে থোকায় থোকায় ঝুলে রয়েছে ছোট আকৃতির মিষ্টি ও টক-মিষ্টি স্বাদের পাকা কমলা। এই দৃশ্য যেমন চমৎকার, তেমনি সুঘ্রাণে চারদিক মুখরিত হয়ে আছে।
রাসেল মিয়ার এই বিষমুক্ত ও ফরমালিনমুক্ত তাজা কমলা কিনতে এবং এক নজর দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় করছেন তার বাগানে। বাগান থেকেই প্রতি কেজি কমলা ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি অনলাইনের মাধ্যমেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে তার বাগানের রসালো চায়না কমলা।
বাগানে ঘুরতে আসা সজীব হাসান উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “রাসেল ভাইয়ের কমলার বাগান দেখে সত্যি খুব ভালো লাগছে। নিজের হাতে গাছ থেকে কমলা ছিঁড়ে খাওয়ার অনুভূতিই আলাদা। রাসেলের সাফল্য দেখে আমারও ইচ্ছে হচ্ছে এমন একটি বাগান গড়ে তোলার।”
আরেক দর্শনার্থী কেয়া পায়েল বলেন, “আমি আমার ভাইয়ের সাথে এই কমলার বাগান দেখতে এসেছি। পরিবেশটা খুব সুন্দর, এসে অনেক ভালো লাগলো। আমরা বাসার জন্য বাগান থেকে তিন কেজি তাজা কমলা কিনে নিয়েছি।”
বাগান মালিক রাসেল মিয়া বলেন, “২০২১ সালের শেষ দিকে প্রবাস থেকে ফিরে ইউটিউব দেখে ও কৃষি অফিসের পরামর্শে এই বাগানের পরিচর্যা শুরু করি। বর্তমানে দেড় বিঘা কমলার পাশাপাশি আমার প্রায় ৮ বিঘা জমিতে মাল্টা, পেয়ারা, ড্রাগন ফলসহ নানা জাতের ঋতুভিত্তিক সবজির মিশ্র বাগান রয়েছে।”
দেশের বেকার তরুণদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “পরিশ্রম আর প্রবল ইচ্ছেশক্তি থাকলে যে কেউ কৃষি সেক্টরে আসতে পারেন। সঠিক পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিশ্রম করতে পারলে এখান থেকেই সফলতা অর্জন করা সম্ভব।”
শিবচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলিমুজ্জামান খান রাসেলের এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেন, “বাংলাদেশের সমতল ভূমির আবহাওয়ায় কমলা চাষ যেখানে একসময় কঠিন মনে করা হতো, সেখানে রাসেলের এই সাফল্য কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তার এই ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প দেখে এলাকার অনেক বেকার যুবক এখন চাকরির পেছনে না ছুটে আধুনিক মিশ্র ফল চাষে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। শিবচর উপজেলা কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে তাকে এবং নতুন উদ্যোক্তাদের সব সময় প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।”

মাসুম হাওলাদার,মাদারীপুর প্রতিনিধি : 


















