
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বরগুনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ সম্মেলন কক্ষে ‘প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কৌশল ও সুযোগ’ বিষয়ে আয়োজিত পরামর্শ সভা বেসরকারি সংস্থা রূপান্তর এর সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন,
প্লাস্টিক ও পলিথিন দূষণ রোধে শুধু জনসচেতনতা সৃষ্টি নয়, বর্জ্য সংগ্রহের পর তা পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ ও নিরাপদ অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম ও যুবসমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করা জরুরী।
রূপান্তরের উদ্যোগে এবং জার্মান সরকারের সহযোগিতা ও হেলভেটাস জার্মানির সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ‘বাংলাদেশে সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বন ও এর প্রভাববলয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য উন্নয়ন এবং দূষণ হ্রাস’ প্রকল্পের আওতায় এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন রূপান্তরের পরিচালক ফারুক আহমেদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক এ এ এস এম কাশেম ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল্লাহ খালিদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি ও সাংবাদিক মনির হোসেন কামাল।
সভায় রূপান্তর ইকো সুন্দরবন প্রকল্পের সমন্বয়কারী শুভাশিষ ভট্টাচার্য, হেলভেটাস বাংলাদেশের কর্মসূচি প্রধান শাহরিয়ার মান্নান, রূপান্তরের সুন্দরবন প্রকল্পের জেলা সমন্বয়কারী অনুপ রায়, বরগুনা জেলা সমন্বয়কারী মো. খলিলুর রহমান, ইকো সুন্দরবন প্রকল্পের পিরোজপুর জেলা সমন্বয়কারী শাহিদা বানু সোনিয়া এবং রূপান্তরের বরগুনা মাঠ কর্মকর্তা আবিদা সুলতানাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও পলিথিনের ব্যবহার পরিবেশের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে অপরিকল্পিতভাবে ফেলা প্লাস্টিক ও পলিথিন নদী-খাল হয়ে সুন্দরবন ও সমুদ্রে গিয়ে পড়ছে। এতে জলজ প্রাণী, ম্যানগ্রোভ বন, জীববৈচিত্র্য এবং সুন্দরবননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে।
বক্তারা বলেন, সরকার ‘জাতীয় ৩আর কৌশল ২০১০’ এবং ‘কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা ২০২১’-এর মাধ্যমে বর্জ্য হ্রাস, পুনর্ব্যবহার ও পুনঃপ্রক্রিয়াকরণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। কিন্তু এসব নীতির মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। উৎস পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ, বর্জ্য সংগ্রহ এবং সংগ্রহের পর পুনর্ব্যবহার বা নিরাপদ অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা অনেক এলাকায় গড়ে ওঠেনি।
সভায় বলা হয়, সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সংগৃহীত প্লাস্টিক ও পলিথিনের পরবর্তী ব্যবস্থাপনা। অনেক উপজেলায় এমনকি পৌরসভা পর্যায়েও বর্জ্য সংগ্রহের পর তা পুনর্ব্যবহার, পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ কিংবা নিরাপদে অপসারণের পর্যাপ্ত অবকাঠামো নেই। ফলে মানুষ বর্জ্য আলাদা করে রাখলেও শেষ পর্যন্ত তা কোথায় যাবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু পৌরসভা বা স্থানীয় সরকারের ব্যয় হিসেবে না দেখে একটি টেকসই ও সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় উদ্যোক্তা, জনসম্পৃক্ত সংগঠন ও অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীদের সম্পৃক্ত করা গেলে এ খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
বাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত ফি এবং জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত কম্পোস্ট সার বাজারজাতের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আংশিকভাবে স্বনির্ভর করা সম্ভব বলেও সভায় মত দেওয়া হয়। এজন্য স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে বেসরকারি খাতের সঙ্গে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
সভা থেকে প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়, জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে বরগুনায় প্লাস্টিক দূষণ কমানোর পাশাপাশি একটি টেকসই, পরিবেশবান্ধব ও অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মডেল গড়ে তোলা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।
সভায় বক্তারা আরও বলেন, প্লাস্টিক দূষণ কোনো একক প্রতিষ্ঠান বা বিভাগের সমস্যা নয়। এটি পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ, ব্যবসায়ী সংগঠন, বর্জ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, যুবসমাজ, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে একই প্ল্যাটফর্মে এনে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
মেজবাহ মাসুম : 


















