Dhaka ০৩:৩৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনামঃ

জন্মটাই কি তাহলে আজন্ম পাপ

রাতের আঁধার নেমে আসার মুখেই একটি অবুঝ ক্রন্দনধ্বনি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল চারপাশ। রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপ আর ড্রেনের স্যাঁতসেঁতে কালচে দুর্গন্ধের মাঝে লাল কাপড়ে নয়, কেবল ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পড়ে ছিল একটি কুঁড়ি। বয়স মাত্র একদিন। পৃথিবীর আলো বাতাসে চোখের পাতা ঠিকমতো মেলার সুযোগও যে এখনও পায়নি, তাকেই ঠেলে দেওয়া হলো মৃত্যুর কোল ঘেঁষে।

​বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহেশগঞ্জ এলাকায় সমীরের বাড়ির গলির পেছনের একটি ড্রেনের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় এই নিষ্পাপ নবজাতক কন্যাশিশুটিকে। স্থানীয় পথচারীদের নজরে আসায় অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচে তার। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয়েছে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। চিকিৎসক আর নার্সদের মমতায় হয়তো তার একটি ছোট শরীর সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছে, কিন্তু যে প্রশ্নটি এই সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে—তা বড্ড ভারী।

আরও পড়ুনঃ  নগরকান্দায় সারের ডিলার নিয়োগের জেরে যুবদল নেতাকে হাতুড়িপেটা, আহত ৫

​

​যে শিশুটি কয়েক ঘণ্টা আগেও মাতৃগর্ভে সুরক্ষিত ছিল, পৃথিবীর বুকে পা রাখার পরপরই সে পেল এক নির্মম প্রত্যাখ্যান। কিন্তু কেন? কিসের অপরাধে একটি একদিনের নবজাতককে নর্দমার পাশে ফেলে আসা হলো? সামাজিক লোকলজ্জা, অবৈধ সম্পর্কের কালিমা মোছার চেষ্টা, নাকি কন্যাশিশু হওয়ার কোনো চরম নির্মমতা—ঠিক কোন অজুহাতে এই নিষ্পাপ প্রাণটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো, তা এখনও রহস্যে ঘেরা।
​সমাজের পাপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো এমন একজনের কাঁধে, যে নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে আসেনি। অপরাধ করল প্রাপ্তবয়স্ক কিছু মানুষ, আর তার আজীবনের সাজা বইতে দেওয়া হলো এক নিষ্পাপ শিশুকে।

আরও পড়ুনঃ  গাজীপুরে চাঁদা না পেয়ে পাইকারি মার্কেটে আগুন দেওয়ার হুমকি, গ্রেপ্তার ১

​আইন আর সমাজের খাতায় বাবার নাম, মায়ের পরিচয় একটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু এই কুঁড়ির কপালে শুরুতেই লিখে দেওয়া হলো এক অনিশ্চিত অন্ধকার। যখন সে বড় হবে, যখন চারপাশের পৃথিবী তাকে প্রশ্ন করবে—”তোমার বাবা কে? তোমার পরিচয় কী?”—তখন এই সমাজ কি তাকে আলিঙ্গন করে নেবে, নাকি প্রতি পদে পদে ছুড়ে দেবে করুণা কিংবা লাঞ্ছনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি?
​আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও পরিচয়হীন শিশুদের সহজে মেনে নিতে শেখে নাই। পিতৃ-মাতৃহীন এই শিশুটির শিক্ষাজীবন, আইনি পরিচয়, সমাজে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা—সবকিছুই আজ এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন।

​ঘটনার পর বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, নবজাতকের পরিচয় ও তার মা-বাবার সন্ধান বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্ত চলছে কে বা কারা শিশুটিকে সেখানে ফেলে গেছে।
​কিন্তু আইনের কাঠগড়ায় অপরাধীরা চিহ্নিত হলেও, যে মানসিক ক্ষত নিয়ে এই শিশুটিকে বেড়ে উঠতে হবে, তা মুছে দেওয়ার সাধ্য কি কোনো আইনের আছে?
​

আরও পড়ুনঃ  যশোরে ১২'বছরের মাদ্রাসা ছাত্রকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগ: গ্রেপ্তার শিক্ষক

​উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে পাঠানো শিশুটির দৈহিক সুস্থতা হয়তো চিকিৎসায় ফিরে আসবে। হয়তো কোনো হৃদয়বান দম্পতি তাকে দত্তক নেবেন, তাকে নাম দেবেন, ভালোবাসা দেবেন। কিন্তু সমাজের অন্ধ গলি পেরিয়ে এই শিশুর সার্বিক ভবিষ্যৎ এবং মানসিক নিরাপত্তা বজায় রাখা আমাদের সবার জন্য এক বড় পরীক্ষা।

​একটি নবজাতককে ড্রেনে ফেলে যাওয়ার দৃশ্য কেবল একটি একক অপরাধ নয়, এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মানবিকতার চরম দেউলিয়াত্বের এক কদর্য প্রতিচ্ছবি। শিশুটির নিষ্পাপ মুখটি আজ প্রশ্ন তুলছে আমাদের বিবেকের কাছে—জন্মটাই কি তবে তার আজন্ম পাপ?

জনপ্রিয় পোস্ট

জন্মটাই কি তাহলে আজন্ম পাপ

জন্মটাই কি তাহলে আজন্ম পাপ

আপডেটের সময়: ০১:৩৮:৩৯ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬

রাতের আঁধার নেমে আসার মুখেই একটি অবুঝ ক্রন্দনধ্বনি মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ করে দিয়েছিল চারপাশ। রাস্তার পাশে আবর্জনার স্তূপ আর ড্রেনের স্যাঁতসেঁতে কালচে দুর্গন্ধের মাঝে লাল কাপড়ে নয়, কেবল ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পড়ে ছিল একটি কুঁড়ি। বয়স মাত্র একদিন। পৃথিবীর আলো বাতাসে চোখের পাতা ঠিকমতো মেলার সুযোগও যে এখনও পায়নি, তাকেই ঠেলে দেওয়া হলো মৃত্যুর কোল ঘেঁষে।

​বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মহেশগঞ্জ এলাকায় সমীরের বাড়ির গলির পেছনের একটি ড্রেনের পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় এই নিষ্পাপ নবজাতক কন্যাশিশুটিকে। স্থানীয় পথচারীদের নজরে আসায় অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচে তার। প্রাথমিক চিকিৎসার পর বেগমগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে স্থানান্তর করা হয়েছে নোয়াখালী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে। চিকিৎসক আর নার্সদের মমতায় হয়তো তার একটি ছোট শরীর সাময়িক স্বস্তি পাচ্ছে, কিন্তু যে প্রশ্নটি এই সমাজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে—তা বড্ড ভারী।

আরও পড়ুনঃ  নগরকান্দায় সারের ডিলার নিয়োগের জেরে যুবদল নেতাকে হাতুড়িপেটা, আহত ৫

​

​যে শিশুটি কয়েক ঘণ্টা আগেও মাতৃগর্ভে সুরক্ষিত ছিল, পৃথিবীর বুকে পা রাখার পরপরই সে পেল এক নির্মম প্রত্যাখ্যান। কিন্তু কেন? কিসের অপরাধে একটি একদিনের নবজাতককে নর্দমার পাশে ফেলে আসা হলো? সামাজিক লোকলজ্জা, অবৈধ সম্পর্কের কালিমা মোছার চেষ্টা, নাকি কন্যাশিশু হওয়ার কোনো চরম নির্মমতা—ঠিক কোন অজুহাতে এই নিষ্পাপ প্রাণটিকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো, তা এখনও রহস্যে ঘেরা।
​সমাজের পাপের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হলো এমন একজনের কাঁধে, যে নিজের ইচ্ছায় এই পৃথিবীতে আসেনি। অপরাধ করল প্রাপ্তবয়স্ক কিছু মানুষ, আর তার আজীবনের সাজা বইতে দেওয়া হলো এক নিষ্পাপ শিশুকে।

আরও পড়ুনঃ  মাদক ছেড়ে স্কাউটিং করি: ডিমলায় ১৩তম উপজেলা স্কাউট সমাবেশ সম্পন্ন

​আইন আর সমাজের খাতায় বাবার নাম, মায়ের পরিচয় একটি মানুষের বেঁচে থাকার মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু এই কুঁড়ির কপালে শুরুতেই লিখে দেওয়া হলো এক অনিশ্চিত অন্ধকার। যখন সে বড় হবে, যখন চারপাশের পৃথিবী তাকে প্রশ্ন করবে—”তোমার বাবা কে? তোমার পরিচয় কী?”—তখন এই সমাজ কি তাকে আলিঙ্গন করে নেবে, নাকি প্রতি পদে পদে ছুড়ে দেবে করুণা কিংবা লাঞ্ছনার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি?
​আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এখনও পরিচয়হীন শিশুদের সহজে মেনে নিতে শেখে নাই। পিতৃ-মাতৃহীন এই শিশুটির শিক্ষাজীবন, আইনি পরিচয়, সমাজে মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকা—সবকিছুই আজ এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন।

​ঘটনার পর বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শামসুজ্জামান জানিয়েছেন, নবজাতকের পরিচয় ও তার মা-বাবার সন্ধান বের করার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। তদন্ত চলছে কে বা কারা শিশুটিকে সেখানে ফেলে গেছে।
​কিন্তু আইনের কাঠগড়ায় অপরাধীরা চিহ্নিত হলেও, যে মানসিক ক্ষত নিয়ে এই শিশুটিকে বেড়ে উঠতে হবে, তা মুছে দেওয়ার সাধ্য কি কোনো আইনের আছে?
​

আরও পড়ুনঃ  টাঙ্গাইলের নাগরপুরে ৬'বছরের শিশু ধর্ষণ মামলার আসামী গ্রেফতার করেছে এসআরবি

​উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ২৫০ শয্যার হাসপাতালে পাঠানো শিশুটির দৈহিক সুস্থতা হয়তো চিকিৎসায় ফিরে আসবে। হয়তো কোনো হৃদয়বান দম্পতি তাকে দত্তক নেবেন, তাকে নাম দেবেন, ভালোবাসা দেবেন। কিন্তু সমাজের অন্ধ গলি পেরিয়ে এই শিশুর সার্বিক ভবিষ্যৎ এবং মানসিক নিরাপত্তা বজায় রাখা আমাদের সবার জন্য এক বড় পরীক্ষা।

​একটি নবজাতককে ড্রেনে ফেলে যাওয়ার দৃশ্য কেবল একটি একক অপরাধ নয়, এটি আমাদের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক মানবিকতার চরম দেউলিয়াত্বের এক কদর্য প্রতিচ্ছবি। শিশুটির নিষ্পাপ মুখটি আজ প্রশ্ন তুলছে আমাদের বিবেকের কাছে—জন্মটাই কি তবে তার আজন্ম পাপ?