অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিংগাহারা নদী। খনন কাজ শুরু না হওয়ায় স্থানীয়দের মাঝে বাড়ছে ক্ষোভ। হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময়ের খরস্রোতা এই জলধারা।
একসময় বছরের বারো মাস পানিতে টইটম্বুর থাকত নদীটি। বর্ষার উচ্ছ্বসিত স্রোত আর শুষ্ক মৌসুমের স্বাভাবিক প্রবাহে এটি ছিল ডিমলার কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে অবহেলা, দখল, দূষণ, পলি জমে ভরাট এবং পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নদীটি আজ মৃতপ্রায়।
সরকার সারাদেশে ৫৪টি জায়গায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় নদীর জলজ প্রাণী রক্ষা ও কৃষকের সেচ কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে ডিমলার সিংগাহারা নদীর ৭ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৩০ মিটার প্রস্থ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় নীলফামারী পানি উন্নয়ন বোর্ড নদীর সীমানা নির্ধারণ করে খুঁটি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করলেও এখনো শুরু হয়নি বহুল প্রত্যাশিত খনন কার্যক্রম। এতে স্থানীয়দের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নদী পুনরুদ্ধারে একাধিকবার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে দৃশ্যমান কোনো খনন কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে দিন দিন নদীটি আরও সংকুচিত হচ্ছে এবং হারিয়ে যাচ্ছে এর অস্তিত্ব। সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর বড় একটি অংশ কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। কোথাও কোথাও নদীর বুকে জেগে উঠেছে চর। পানির গভীরতা এতটাই কমে গেছে যে, অনেক স্থানে মানুষ হেঁটেই নদী পার হচ্ছেন। নদীর দুই পাড়ে ঝোপঝাড়, আগাছা ও ময়লার স্তূপ জমে পরিবেশের মারাত্মক অবনতি ঘটেছে।
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, আশি ও নব্বইয়ের দশকেও সিংগাহারা নদীতে সারা বছর পানি থাকত। নদী থেকে কৃষকরা সেচের পানি নিতেন, জেলেরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় নদীর গভীরতা কমতে থাকে। পরে পানির প্রবাহও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, শহরের বিভিন্ন এলাকার ড্রেনের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে নদীর পানি দূষিত হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালির আবর্জনা ও বিভিন্ন বর্জ্যে নদীর পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নদীর স্বাভাবিক বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হচ্ছে এবং জলজ প্রাণীর আবাস ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, কচুরিপানায় তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়ায় ব্রিজের নিচ দিয়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সিংগাহারা নদীতে বোরো মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি না থাকায় সেচ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আগে নদীর পানি নৌকা, সেউতি, বালতি, টিন ইত্যাদি দেশীয় পদ্ধতি ব্যবহার করে সহজেই জমিতে সেচ দেওয়া যেত। এখন সেই সুযোগ না থাকায় কৃষকদের অতিরিক্ত খরচ করে গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
স্থানীয়রা জানান, একসময় এই নদীতে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ পাওয়া যেত। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস হয়েছে। দূষণের কারণে আগের মতো এখন আর নদীতে পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না।
পরিবেশ সচেতন মহলের মতে, নদী শুধু পানির উৎস নয়, এটি একটি অঞ্চলের পরিবেশ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। একটি নদী মৃত হয়ে গেলে তার প্রভাব চারপাশের পুরো পরিবেশের ওপর পড়ে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়, জীববৈচিত্র্য কমে যায় এবং কৃষি উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু সীমানা নির্ধারণ করে খুঁটি স্থাপন করলেই হবে না। দ্রুত সিংগাহারা নদী খননের মাধ্যমে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে।
নদী পুনরুদ্ধারের বিষয়ে ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ ইমরানুজ্জামান বলেন, সরকার সারাদেশে ৫৪টি জায়গায় খাল খননের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার সিংগাহারা নদীটির সীমানা নির্ধারণের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করে খনন কার্যক্রম উদ্বোধন করেছেন নীলফামারী জেলা প্রশাসক মোঃ নায়িরুজ্জামান। নদী পুনরুদ্ধারের জন্য প্রয়োজনীয় খনন কার্যক্রম বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। খনন কাজ শুরু হলে নদীর পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং পরিবেশগত ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নদীতে যাতে কেউ বর্জ্য না ফেলে সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, আশ্বাসে আর ভরসা নেই। দ্রুত খনন কাজ শুরু না হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহ্যবাহী সিংগাহারা নদী। সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, নদী পুনরুদ্ধারে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে।
স্থানীয়দের ভাষায়, সিংগাহারা শুধু একটি নদী নয়, এটি ডিমলার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি প্রাণপ্রবাহ। সবার একটাই প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের অবহেলার অবসান ঘটিয়ে দ্রুত খনন কার্যক্রম শুরু হোক, ফিরিয়ে আনা হোক সিংগাহারা নদীর হারানো যৌবন।