কোমরে গোঁজা ৫ হাজারের বেশি ইয়াবা, আর দামি রয়েল এনফিল্ড মোটরসাইকেলের টুলবক্সে লুকানো আরও ৪ হাজার পিস। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিতে তার বাহন ও পোশাক ছিল বেশ রাজকীয়। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র অধিপতি ওমর ফারুক ওরফে ‘বুলেট ফারুক’ (৪৪) অবশেষে ধরা পড়েছে যৌথ বাহিনীর পাতা জালে।
বুধবার (১০ জুন) সন্ধ্যায় নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার জমিদারহাট পূর্ব বাজার এলাকার ফেনী-চৌমুহনী মহাসড়কে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) ও র্যা বের এক শ্বাসরুদ্ধকর যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারকৃত ফারুক বেগমগঞ্জ উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের লতিফপুর গ্রামের মৃত আব্দুল খালেকের ছেলে।
ডিএনসি ও র্যা বের বিশেষ গোয়েন্দা দল বেশ কিছুদিন ধরেই বুলেট ফারুকের ওপর নজর রাখছিল। বুধবার বিকেলে নিশ্চিত তথ্য আসে যে, ফারুক চট্টগ্রাম থেকে ইয়াবার একটি বড় চালান নিয়ে নোয়াখালীর দিকে রওনা হয়েছে।
তৎক্ষণাৎ ফেনী-চৌমুহনী মহাসড়কের জমিদারহাট এলাকায় কৌশলগত চেকপোস্ট বসায় যৌথ বাহিনী। সন্ধ্যা নামার মুখে ফারুকের দ্রুতগতির রয়েল এনফিল্ড মোটরসাইকেলটি চেকপোস্টের দিকে আসতে দেখে সিগন্যাল দেওয়া হয়। সে পালানোর চেষ্টা করলে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাকে আটকে দেওয়া হয়।
ফারুকের দেহ তল্লাশি করে পরনের কাপড়ের নিচে কোমরের বেল্টের সাথে বিশেষ কায়দায় স্কচটেপ দিয়ে মোড়ানো ৫,৩১০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মোটরসাইকেল তল্লাশি তার ব্যবহৃত রয়েল এনফিল্ড বাইকটির টুলবক্সের ভেতর বিশেষভাবে তৈরি গোপন চেম্বার থেকে আরও ৪,০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাদক বিক্রির নগদ ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং সিন্ডিকেটের খুচরা বিক্রেতাদের সাথে যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ২টি স্মার্টফোন জব্দ করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বুলেট ফারুক মাদক চোরাচালানের যে অভিনব কৌশলের কথা জানিয়েছে, তা শুনে খোদ তদন্তকারী কর্মকর্তারাও চমকে গেছেন।
ফারুক জানায়, সাধারণত দূরপাল্লার বাসে বা ট্রাকে মাদক পরিবহন করলে ধরা পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই সে নিজেই বিলাসবহুল ও দ্রুতগতির ‘রয়েল এনফিল্ড’ মোটরসাইকেল কিনে নেয়। একজন শৌখিন বাইকার সেজে সে প্রতি সপ্তাহে অন্তত ২ থেকে ৩ বার চট্টগ্রাম (প্রয়োজনে টেকনাফ সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা) চলে যেত। সেখান থেকে ইয়াবার বড় চালান নিয়ে চোখের পলকে মহাসড়ক পাড়ি দিয়ে নোয়াখালী চলে আসত। দামি বাইক হওয়ায় সাধারণত হাইওয়ে পুলিশ বা চেকপোস্টগুলো তাকে সন্দেহ করত না।
তদন্তে জানা গেছে, ফারুক নোয়াখালী ও ফেনী জেলার সীমান্ত অঞ্চলে মাদকের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে। জেলাজুড়ে মাদক বিতরণের জন্য তার নিজস্ব ৩টি খুচরা সিন্ডিকেট (গ্যাং) রয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে আনা ইয়াবাগুলো মূলত নিচের এলাকাগুলোতে পাইকারি ও খুচরা সরবরাহ করা হতো:
1. বেগমগঞ্জ জোন: লতিফপুর, হাজীপুর, রসুলপুর ও জমিদারহাট।
2. সেনবাগ জোন: সেবারহাট, ছবির মুন্সিরহাট ও কাবিলপুর।
3. ফেনী জোন: দাগনভূঞা উপজেলার বিভিন্ন স্পট।
ফারুক নিজে সরাসরি খুচরা বিক্রি করত না। সে সিন্ডিকেটের প্রধানদের কাছে ইয়াবা পৌঁছে দেওয়ার পর তারা নিজস্ব নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তা প্রত্যন্ত অঞ্চলের যুবসমাজের হাতে তুলে দিত।
বুলেট ফারুক কোনো আনাড়ি অপরাধী নয়, সে একজন পেশাদার ও দাগী মাদক কারবারি। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর রেকর্ড অনুযায়ী, নোয়াখালীর সেনবাগ ও বেগমগঞ্জ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও ডবলমুরিং এবং ফেনীর দাগনভূঞা থানায় অস্ত্র ও মাদক আইনসহ ফারুকের বিরুদ্ধে মোট ১১টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা এলাকা থেকে ১১ হাজার পিস ইয়াবাসহ তাকে গ্রেপ্তার করেছিল প্রশাসন। কিন্তু আইনি ফাঁকফোকর গলে একই বছরের ডিসেম্বর মাসে সে জামিনে মুক্ত হয়ে আসে। জেল থেকে বের হয়েই কোনো অনুশোচনা ছাড়াই সে আবারও তার পুরনো ‘রয়েল এনফিল্ড’ মিশনে নেমে পড়ে।
গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) নোয়াখালী জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুব্রত সরকার শুভ বলেন: "বুলেট ফারুক নোয়াখালীর মাদক জগতের অন্যতম শীর্ষ গডফাদার। তার বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করে থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। সে জামিনে বের হয়ে বারবার সমাজকে বিষাক্ত করছে, তাই এবার আমরা তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করব। জেলার তালিকাভুক্ত কোনো মাদক কারবারিকে ছাড় দেওয়া হবে না। মাদকের মূল উপড়ে ফেলতে আমাদের এই যৌথ চিরুনি অভিযান অব্যাহত থাকবে।"
এলাকাবাসীর দাবি, বুলেট ফারুকের মতো শীর্ষ অপরাধীরা যাতে সহজে জামিন পেয়ে পুনরায় এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়তে না পারে, সেজন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেন জোরালো আইনি তদারকি করা হয়।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ রায়হান মাহামুদ।
অফিস : কুড়িল বিশ্বরোড) বারিধারা, ঢাকা-১২২৯।
ই পেপার