জিলহজ্জের পবিত্র দিনগুলো ঘনিয়ে এলে মুসলিম বিশ্বে এক বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়। আকাশে ভেসে ওঠে ত্যাগের স্মৃতি, মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত হয় আত্মসমর্পণের অনুভূতি, আর সমাজজুড়ে শুরু হয় কুরবানীর প্রস্তুতি। পশুর হাট, মানুষের ব্যস্ততা, ঈদের আয়োজন সবকিছু মিলিয়ে যেন মুসলিম উম্মাহ আবারও ফিরে যায় সেই মহান ইবরাহিমী ইতিহাসের দিকে, যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সবচেয়ে প্রিয় জিনিসও উৎসর্গ করতে দ্বিধা করা হয়নি।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সময়ের প্রবাহে কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা ও আত্মিক তাৎপর্য অনেক ক্ষেত্রেই বাহ্যিক আয়োজন ও সামাজিক প্রতিযোগিতার আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কুরবানীকে কেবল পশু জবাই, গোশত বিতরণ কিংবা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের একটি উপলক্ষ হিসেবে দেখছেন। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে কুরবানী নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি ঈমান, তাকওয়া, হালাল উপার্জন, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের এক মহান ইবাদত।
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন, 'আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।'(সূরা আল-হাজ্জ ৩৭)
এই একটি আয়াত কুরবানীর প্রকৃত দর্শনকে স্পষ্ট করে দেয়। আল্লাহর কাছে পশুর ওজন, আকার, মূল্য কিংবা বাহ্যিক চাকচিক্যের কোনো মূল্য নেই, যদি অন্তরে তাকওয়া না থাকে। কুরবানীর মূল শিক্ষা হলো মানুষ নিজের প্রবৃত্তি, লোভ, অহংকার ও দুনিয়াবি আসক্তিকে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিসর্জন দিতে শিখবে।
ইসলামের ইতিহাসে কুরবানীর সূচনা মানবজাতির প্রথম পরিবার থেকেই। আদম আ. এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল উভয়েই আল্লাহর উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ করেছিলেন। কিন্তু একজনের কুরবানী কবুল হয়েছিল, অন্যজনেরটি হয়নি। কুরআন এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছে, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ মুত্তাকিদের পক্ষ থেকেই গ্রহণ করেন।' (সূরা আল-মায়িদাহ, ২৭)
ইমাম ইবন কাসির তাঁর তাফসিরে উল্লেখ করেন, হাবিল উত্তম ও প্রিয় বস্তু আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করেছিলেন আন্তরিকতার সঙ্গে, পক্ষান্তরে কাবিলের অন্তরে ছিল কৃপণতা ও আত্মপ্রবঞ্চনা। এখান থেকেই ইসলাম শিক্ষা দেয় ইবাদতের সৌন্দর্য বাহ্যিকতায় নয়, বরং নিয়তের বিশুদ্ধতায়।
কুরবানীর সর্বোচ্চ প্রতীক হয়ে আছেন ইব্রাহিম আ.। আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রাণাধিক সন্তান ইসমাঈল আ. কে কুরবানী করার জন্য প্রস্তুত হওয়া ছিল মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ আত্মত্যাগের ঘটনা। একজন পিতা যখন আল্লাহর আদেশে নিজের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস বিসর্জন দিতে প্রস্তুত হন, তখনই তিনি 'খলিলুল্লাহ' উপাধিতে ভূষিত হন।
এই ঘটনা কেবল ইতিহাস নয়, এটি প্রতিটি মুসলমানের জন্য আত্মসমর্পণের শিক্ষা। কুরবানী আমাদের শেখায় আল্লাহর ভালোবাসার সামনে দুনিয়ার সবকিছুই তুচ্ছ।
ইমাম গাজ্জালী তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন-এ লিখেছেন, 'কুরবানীর প্রকৃত উদ্দেশ্য পশু জবাই নয়, বরং মানুষের অন্তরের পশুত্বকে জবাই করা।'
আজকের সমাজে কুরবানীকে কেন্দ্র করে যে প্রদর্শনীর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কে কত বড় গরু কিনলো, কার পশুর দাম কত, কার আয়োজন বেশি জাঁকজমকপূর্ণ এসব নিয়ে প্রতিযোগিতা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পশুর ছবি ও মূল্য প্রদর্শন যেন অনেকের কাছে ধর্মীয় আবেগের চেয়ে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠেছে। অথচ ইসলামে রিয়া বা লোকদেখানো আমলকে কঠোরভাবে নিন্দা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ দ. বলেছেন, 'আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরককে।' সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, ছোট শিরক কী? তিনি বললেন, 'রিয়া বা লোকদেখানো আমল।'(মুসনাদে আহমদ)
কুরবানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো হালাল উপার্জন। বর্তমান সমাজে অনেকেই সুদ, ঘুষ,ইয়াবা ব্যবসা, দুর্নীতি, প্রতারণা কিংবা হারাম উপার্জনের অর্থে কুরবানী করেন, অথচ তারা ধারণা করেন, বড় পশু কুরবানী করলেই আল্লাহ সন্তুষ্ট হয়ে যাবেন। কিন্তু ইসলাম এ ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
রাসূল দ. বলেছেন 'নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া গ্রহণ করেন না।'(সহীহ মুসলিম)
ইমাম নববী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, হারাম সম্পদ দ্বারা সম্পাদিত ইবাদত বাহ্যিকভাবে শুদ্ধ মনে হলেও তার গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম বলেন, 'হারাম খাদ্য ও সম্পদ মানুষের অন্তরকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে দেয়, ফলে সেই অন্তরের ইবাদতে প্রাণ ও নূর অবশিষ্ট থাকে না।'
আজ মুসলিম সমাজের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো মানুষ বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয়ে যতটা সচেতন, হালাল-হারামের প্রশ্নে ততটা সতর্ক নয়। অথচ ইসলামি শরিয়তে হালাল উপার্জন ইবাদতের ভিত্তি। হারাম সম্পদে নির্মিত ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা আত্মিকভাবে শূন্য হয়ে পড়ে।
কুরবানী কার ওপর ওয়াজিব এ প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম আবু হানিফা-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন এবং নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রত্যেক মুসলিমের ওপর কুরবানী ওয়াজিব। অন্যদিকে ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল কুরবানীকে সুন্নতে মুয়াক্কাদা বলেছেন। যদিও পরিভাষাগত পার্থক্য রয়েছে, তবে সকল ইমাম একমত সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী ত্যাগ করা অত্যন্ত অনুচিত।
রাসূল দ. বলেছেন,'যার সামর্থ্য আছে অথচ সে কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।'(ইবনে মাজাহ)
কুরবানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সহমর্মিতা। ইসলামে কুরবানীর গোশত আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সমাজে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়। কুরবানী ধনী-গরিবের মাঝে এক মানবিক সেতুবন্ধন তৈরি করে।
আজকের পৃথিবী ভোগবাদ, আত্মকেন্দ্রিকতা ও দুনিয়াবি প্রতিযোগিতায় আক্রান্ত। মানুষ সম্পদ অর্জনে ব্যস্ত, কিন্তু আত্মার পরিশুদ্ধির কথা ভুলে যাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কুরবানী মুসলিম সমাজকে আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় ত্যাগ ছাড়া ঈমান পূর্ণতা পায় না।
প্রকৃত কুরবানী তাই কেবল পশু জবাইয়ের নাম নয়, এটি নিজের অহংকার, লোভ, কৃপণতা, হারাম আসক্তি এবং দুনিয়াবি মোহকে আল্লাহর জন্য কুরবানী করার শিক্ষা। যে কুরবানী মানুষকে হালাল জীবনের দিকে ফিরিয়ে আনে, অন্তরে তাকওয়া সৃষ্টি করে এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের শক্তি জাগ্রত করে, সেই কুরবানীই প্রকৃত ইবরাহিমী কুরবানী।
লেখক কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ রায়হান মাহামুদ।
অফিস : কুড়িল বিশ্বরোড) বারিধারা, ঢাকা-১২২৯।
ই পেপার